সংবাদ শিরোনাম ::
কাজীপুরে যমুনার ভাঙনে নদীগর্ভে অর্ধশত বিঘা ফসলি জমি উল্লাপাড়ায় নৌকা বাইচে সংঘর্ষ, ডুবে গেল দুই প্রতিযোগী নৌকা দুনিয়ার মোহ পেরিয়ে হৃদয়ের কাছে ফেরার গল্প ‘মোহমুক্ত হৃদয়’ শাহজাদপুরে দাম্পত্য কলহের জেরে লাঠির আঘাতে মায়ের কোলে ৯ মাসের শিশুর মৃত্যু উল্লাপাড়ায় দীর্ঘদিন পর মাসব্যাপী ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প-বাণিজ্য মেলা শুরু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণের চেষ্টা করা হচ্ছে: রফিকুল ইসলাম খান সিরাজগঞ্জে শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক নির্বাচিত শরীফুল ইসলাম সিরাজগঞ্জে সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বন্ধ থাকবে সব কোচিং সেন্টার ১৫৬ অসহায় মেয়ের বিয়ে, বাবার দায়িত্ব পালন করে দৃষ্টান্ত গড়লেন মামুন বিশ্বাস ভাঙ্গায় বিশ্ব উরস শরীফ–২০২৭ উপলক্ষে জাকের পার্টির ইসলামী জলসা ও কর্মী সভা

কাজীপুরে যমুনার ভাঙনে নদীগর্ভে অর্ধশত বিঘা ফসলি জমি

কাজিপুর প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০২:১১:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬
  • / ৫৪০ বার পড়া হয়েছে

সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যমুনা নদীর ভাঙন। বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে শুরু হয়েছে নদীভাঙন। এতে ইতোমধ্যে অন্তত অর্ধশত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক, সেতুসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এতে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও হাহাকার।

যমুনাবিধৌত কাজীপুর উপজেলার পূর্ব পাশ দিয়ে যমুনা এবং পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ইছামতি নদী। প্রতিবছর নদীভাঙনে উপজেলার আয়তন ও ফসলি জমি কমছে। একই সঙ্গে ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক পরিবারকে অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, যমুনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশে বড় বড় গর্ত তৈরি হচ্ছে। এতে নদীর স্রোতের গতিপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চরাঞ্চলের চরগিরিশ, ভেটুয়াসহ কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহের ভাঙনেই প্রায় ২০ বিঘা তিন ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর চরগিরিশ ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যমুনার তীব্র ভাঙন চলছে। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে নিজেদের ফসলি জমি নদীতে বিলীন হতে দেখছেন কৃষকরা। অনেকেই হারানো জমির দিকে তাকিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন শুরু হওয়ার পরও তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি প্রাথমিকভাবে ভাঙন ঠেকাতে পর্যাপ্ত জিও ব্যাগও ফেলা হয়নি।

ভেটুয়া গ্রামের বাসিন্দা আজিবার আলী বলেন, ‘নদীতে অবৈধভাবে বালু কাটার কারণে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ফলে আমাদের জমি ভেঙে নদীতে চলে যাচ্ছে। আমার সাত পাখি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ বছর আর কোনো ফসল আবাদ করতে পারিনি। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি—নদীর তীর স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হোক। জমিগুলো রক্ষা করা গেলে আমরা বেঁচে থাকতে পারব।’

নতুন মাইজবাড়ী এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘নদীতে আমার ১৩ বিঘা ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙনে আমরা এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। এ বছরই আরও দুই পাখি জমি নদীতে চলে গেছে। চোখের সামনে নিজের আবাদি জমি নদীতে বিলীন হতে দেখার কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করার দাবি জানাই।’

বিলচতল গ্রামের বাসিন্দা হারুন অর রশিদ বলেন, ‘অবৈধভাবে বালু কাটার কারণে নদীর তলদেশ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। এতে তীরের মাটি আলগা হয়ে স্রোতের টানে ভেঙে যাচ্ছে। এই চরটুকুই আমাদের শেষ সম্বল। এখানে আমরা চাষাবাদ করি এবং গরু-ছাগল চরাই। এটুকুও ভেঙে গেলে আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, কাজীপুর উপজেলার পূর্ব পাশ ঘেঁষে যমুনা এবং পশ্চিম পাশ দিয়ে ইছামতি নদী প্রবাহিত হওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছরই কমবেশি নদীভাঙন দেখা দেয়। বিশেষ করে খাসরাজবাড়ী, নাটুয়াপাড়া, তেকানী, নিশ্চিন্তপুর, মনসুরনগর ও চরগিরিশ ইউনিয়নের চরাঞ্চল এবং মাইজবাড়ী, কাজীপুর, গান্ধাইল ও শুভগাছা ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী এলাকাগুলো ভাঙনপ্রবণ।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘কাজীপুর যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যে ভাঙন দেখা দিয়েছে, সে বিষয়ে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

নদীভাঙন স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও নদীপাড়ের বাসিন্দারা। তাদের আশঙ্কা, সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী দিনে আরও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও বসতভিটা যমুনার গর্ভে বিলীন হতে পারে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

কাজীপুরে যমুনার ভাঙনে নদীগর্ভে অর্ধশত বিঘা ফসলি জমি

আপডেট সময় : ০২:১১:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর ২০২৬

সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে আবারও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যমুনা নদীর ভাঙন। বর্ষা মৌসুমের শেষ দিকে উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে শুরু হয়েছে নদীভাঙন। এতে ইতোমধ্যে অন্তত অর্ধশত বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে বসতবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গ্রামীণ সড়ক, সেতুসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এতে নদীপাড়ের মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে উদ্বেগ ও হাহাকার।

যমুনাবিধৌত কাজীপুর উপজেলার পূর্ব পাশ দিয়ে যমুনা এবং পশ্চিম পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ইছামতি নদী। প্রতিবছর নদীভাঙনে উপজেলার আয়তন ও ফসলি জমি কমছে। একই সঙ্গে ভিটেমাটি হারিয়ে অনেক পরিবারকে অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, যমুনা নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে নদীর তলদেশে বড় বড় গর্ত তৈরি হচ্ছে। এতে নদীর স্রোতের গতিপথ পরিবর্তনের পাশাপাশি তীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী নদীতীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই নতুন নতুন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের আগস্ট থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চরাঞ্চলের চরগিরিশ, ভেটুয়াসহ কয়েকটি এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহের ভাঙনেই প্রায় ২০ বিঘা তিন ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কৃষকরা।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর চরগিরিশ ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে যমুনার তীব্র ভাঙন চলছে। নদীর তীরে দাঁড়িয়ে নিজেদের ফসলি জমি নদীতে বিলীন হতে দেখছেন কৃষকরা। অনেকেই হারানো জমির দিকে তাকিয়ে হতাশা প্রকাশ করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন শুরু হওয়ার পরও তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি প্রাথমিকভাবে ভাঙন ঠেকাতে পর্যাপ্ত জিও ব্যাগও ফেলা হয়নি।

ভেটুয়া গ্রামের বাসিন্দা আজিবার আলী বলেন, ‘নদীতে অবৈধভাবে বালু কাটার কারণে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ফলে আমাদের জমি ভেঙে নদীতে চলে যাচ্ছে। আমার সাত পাখি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এ বছর আর কোনো ফসল আবাদ করতে পারিনি। সরকারের কাছে আমাদের একটাই দাবি—নদীর তীর স্থানীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হোক। জমিগুলো রক্ষা করা গেলে আমরা বেঁচে থাকতে পারব।’

নতুন মাইজবাড়ী এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘নদীতে আমার ১৩ বিঘা ফসলি জমি বিলীন হয়ে গেছে। নদীভাঙনে আমরা এখন নিঃস্ব হয়ে পড়েছি। এ বছরই আরও দুই পাখি জমি নদীতে চলে গেছে। চোখের সামনে নিজের আবাদি জমি নদীতে বিলীন হতে দেখার কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধ করার দাবি জানাই।’

বিলচতল গ্রামের বাসিন্দা হারুন অর রশিদ বলেন, ‘অবৈধভাবে বালু কাটার কারণে নদীর তলদেশ থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। এতে তীরের মাটি আলগা হয়ে স্রোতের টানে ভেঙে যাচ্ছে। এই চরটুকুই আমাদের শেষ সম্বল। এখানে আমরা চাষাবাদ করি এবং গরু-ছাগল চরাই। এটুকুও ভেঙে গেলে আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, কাজীপুর উপজেলার পূর্ব পাশ ঘেঁষে যমুনা এবং পশ্চিম পাশ দিয়ে ইছামতি নদী প্রবাহিত হওয়ায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছরই কমবেশি নদীভাঙন দেখা দেয়। বিশেষ করে খাসরাজবাড়ী, নাটুয়াপাড়া, তেকানী, নিশ্চিন্তপুর, মনসুরনগর ও চরগিরিশ ইউনিয়নের চরাঞ্চল এবং মাইজবাড়ী, কাজীপুর, গান্ধাইল ও শুভগাছা ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী এলাকাগুলো ভাঙনপ্রবণ।

সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘কাজীপুর যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় যে ভাঙন দেখা দিয়েছে, সে বিষয়ে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ভাঙনকবলিত এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

নদীভাঙন স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও নদীপাড়ের বাসিন্দারা। তাদের আশঙ্কা, সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী দিনে আরও বিস্তীর্ণ ফসলি জমি ও বসতভিটা যমুনার গর্ভে বিলীন হতে পারে।